Sunday, 2 February 2014

Just Friends - I

"বন্ধু তাকে ঝড় বাদলে আগলে রাখে,
কাছে পেয়েও বন্ধুকে সে স্বপ্নে ডাকে ।"

আমার একটা বন্ধু ছিল। সে ভীষণ বন্ধু। এমন বন্ধু, যে বলার না। গল্প বা উপন্যাসে যেমন হয়ে থাকে, তার চেয়েও ঢের বেশি। অর্থাৎ কিনা, শ্রীকান্তর ইন্দ্রনাথের চেয়েও বেশি, আর মহেন্দ্রর বিহারির চেয়েও।



মোটামুটি সাত সাগর তের নদীর পেরিয়ে, তদুপরি আরো অগুনতি সংখ্যক তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে সেই বন্ধুটা থাকত। আমার সাথে তার জীবনে কোনোদিন চাক্ষুষ দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, এমনকি কম্পিউটারের পর্দাতেও নয়। তখনকার দিনে ফেসবুক ছিলনা, এটা সেই ডাইনোসরিক অর্কুট যুগের কথা; আর ছিল সেই যুগান্তকারি আন্দোলন ফেলে দেওয়া ইয়াহু মেসেঞ্জার। অতএব যাবতীয় কথাবার্তা আদান-প্রদান সেখানেই ঘটত। আর তার সাথে প্রতিদিন ঘণ্টাখানেক ফোনে। ছুটির দিনগুলোতে সেটা অবধারিতভাবে বেড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টায় গিয়ে দাঁড়াত। একসাথে মাংস রান্না করা (অর্থাৎ, ফোনের ওপার থেকে নুন-হলুদের পরিমাপ নিয়ে অত্যন্ত বিরক্তিকর আন্ সলিসিটেড অ্যাডভাইস), থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ, থেকে আমাদের দুজনের কবে দেখা হবে, বা আদৌ কোনোদিন দেখা হবে কিনা, সেই নিয়ে জল্পনা আর হা-হুতাশ।

এর সাথে ছিল দৈনন্দিন রুটিনে কিছু অবধারিত অভ্যাস তৈরি হয়ে যাওয়া, যেমন একে অপরকে ফোন করে ঘুম থেকে তোলা (সেটা সম্ভব ছিল, কারণ দুজনের টাইমজোন ছিল প্রায় এগারো ঘণ্টার ব্যবধানে), ওর সিগারেট ছাড়া এবং আমার ব্রেকফাস্ট না খাওয়া নিয়ে প্রত্যহ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করা, ইত্যাদি ইত্যাদি। মনের ভাল থাকা, খারাপ থাকা বা স্থিতাবস্থায় অন্যজনের ভাগাভাগি আর অধিকারটা কিভাবে জানিনা বেশ কায়েম হয়ে গেছিল খুব অনায়াশেই।

অদ্ভুতভাবে, অত অত কথা বলার পরেও ফোন রাখার সাথে সাথে আবার কথা বলতে খুব ইচ্ছে করা, এবং আশ্চর্যভাবে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ইচ্ছেটা পূরণ হয়ে যাওয়া, এগুলোও কেমন স্বাভাবিক হয়ে গেছিল। মোট কথা, ফোনের ব্যাটারির আয়ু ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন কার্য বা কারণ আমাদের নিরস্ত করতে পারত না। আর এই ব্যাপারটা সাময়িকও ঠিক বলা চলে না, কারণ বেশ কয়েক বছর ধরে কোন এক্সেপসান ছাড়াই এই রুটিনটা প্রত্যেকদিন ঘটে গেছিল।

মুশকিল বলতে কি কিছুই ছিল না? ছিল।

মুশকিলটা ছিল এই, যে আমার এই বন্ধুটা পুরুষ ছিল, আর তার দুজনের বয়সটাও, যাকে বলে, ডেঞ্জারাস। তায় আবার আমার একজন আস্ত জলজ্যান্ত বয়ফ্রেন্ড ছিল, যার সাথে সম্পর্কটা তদ্দিনে এইবার-বিয়েটা-করে-ফেললেই-হয় জাতীয় জায়গায় পৌঁছে গেছিল। অগত্যা এই বন্ধুত্বটা আহা-কি-টান সত্ত্বেও কির'ম জানি একটা চোরাবালিতে আটকে পড়েছিল।

যদিও পরিস্থিতির পরিবর্তনে সেটি নিজগুণে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি প্রেমের গল্প হয়ে উঠলেও উঠতে পারত বলে আমাদের দুজনেরই বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসের মুখে ছাই দিয়ে বন্ধু-আছি-বন্ধু-থাকব গোছের দীর্ঘনিশ্বাসেই এই গল্পটা ফুরিয়ে গেল।

এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, সাহস করে যদি সেদিন গল্পের মোড়টা সত্যিই ঘোরাতে পারতাম, আজ তাহলে কেমন হত?

বন্ধুটা এখনও জিজ্ঞেস করে এই কথাটা।

আমি গলায় খুব বিরক্তিভাব আর কনফিডেন্স এনে বলি - যা হয়েছে ভালই হয়েছে, জানিস না তুই?