Thursday, 6 February 2014

চেনা দুঃখ চেনা সুখ, অথবা "জাতিস্মর"

শিবের গীত

"জাতিস্মর" সেই মানের সিনেমা, যেটা নিয়ে পরিচালক কিরকম বানিয়েছেন বা গল্পটা কিরকম হয়েছে সেসব নিয়ে কথা বলাটা ধৃষ্টতার পর্যায়ে পড়ে। তাই নিজের ক্ষমতা, রাদার অক্ষমতার কথা মাথায় রেখে তাই বড়জোর যেটা করা যায়, অর্থাৎ যেটা করব ভাবছি, সেটা হল যে সিনেমাটা দেখে আমার মনের মধ্যে কি কি হল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা। এককথায় প্রকাশ করতে হলে অবশ্যই একটা শব্দই মাথায় আসে - "আপ্লুত"। কিন্তু সেটাকেই আরেকটু বিশদভাবে, আনতাবরি বকে এবং ঘেঁটে গিয়ে, ফেনিয়ে বলার চেষ্টা।



কিভাবে পুরো ব্যাপারটা ধরা করা সম্ভব তাই নিয়েও কনফিউসড, তাই সিনেমাটার যে যে বিশেষ ব্যাপারগুলো আলাদা করে মনে দাগ কেটেছে সেগুলোকে টুকরো টুকরো করে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রথম, এক এবং অদ্বিতীয় - "এ তুমি কেমন তুমি"

খানিকটা ভুমিকা করতেই হচ্ছে। এটা বোধ হয় একটা জনৈক ব্যাপার, যে জীবনের নানান স্টেজে নানান প্রেম আর অপ্রেমের স্মৃতিগুলো কি ভাবে যেন বিশেষভাবে প্রিয় কিছু সমকালীন গান দিয়ে কোডেড হয়ে যায়। যেমন "উত্তর আসবেনা, তুমি আসবেই আমি জানি", "ভিনদেশি তারা" বা "আমার মতে তোর মতন কেউ নেই" কিছু বিশেষ মানুষের সাথে এমনভাবে জন্মের মতো স্ট্যাম্প পড়ে গেছে যে সারাজীবনেও বদলাবে না, তা সে গঙ্গা দিয়ে যত জলই বয়ে যাক না কেন। আমি ভাবতাম সব মন-কেমন-করা রোম্যান্টিক গানই বুঝি এরকম। " এ তুমি কেমন তুমি" সেই ধারনাটা ভেঙ্গে দিল। "কথা নয়, নীরবতায়/ সজলতায় আখর ভরো" শুনে অবধারিতভাবে খুব কান্না পেল - নিজের জন্য। প্রথমবার শুনে মনে হল, কি করে আমার কথাটা জানলো? দ্বিতীয়বার এবং তারপর আরও অগুনতিবার শুনে বুঝলাম, শুধু আমার কথা নয়, এটা আসলে সবারই কথা, নিজের নিজের মনের মধ্যের সেই কথাটা, যেটা প্রত্যেকেই ভাবে যে আর কেউ জানে না।

প্রাচীনকাল, এবং অ্যান্টনি -

সিনেমাটার মধ্যে ওই অতীতজন্মের স্মৃতির অংশগুলো সত্যিই পিরিয়ড-ড্রামা শব্দটার মর্যাদা রেখেছে, এবং তার সঙ্গে অবিশ্বাস্য সাবলীলতায় আধুনিককালের সাথে মিলেমিশে গেছে। এই পিরিয়ড-ড্রামা বস্তুটাই বাংলায় খুব কম দেখেছি, যেটুকু দেখেছি তার গতি আর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় রেখে গেছে।  এই সিনেমায় যে ফিউশনটা দেখলাম সেটা, সত্যি বলছি, আগে দেখিওনি আর আশাও করিনি। প্রস্তুতিতে ঠিক কতটা রিসার্চ আর কতটা আন্তরিকতা থাকলে এই পারফেকশান এবং একই সাথে উষ্ণতাটা এইভাবে ধরা যায়, আমার কল্পনায় সত্যি কুলালো না।

অধুনা প্রেম -

অনেকের নাকি এই জায়গাটায় গিয়ে কিন্তু-কিন্তু ঠেকেছে, ইমপ্র্যাক্টিকাল লেগেছে। আসলে তাদের ধারণা, অধুনা প্রেম, তায় কলেজ প্রেম অর্থেই, অপেক্ষা জানেনা, স্রেফ হার-জিত বোঝে, ইত্যাদি। আমার এদের দলে একেবারেই পড়িনা। আমার এই গল্পটা খুব, খুব বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। বরং বলা উচিত, চেনা লেগেছে। আর তাই, খুব ভালও লেগেছে। অপেক্ষাটা, সাধনাটা, অসাধ্য সাধনটা, এবং পাত্র-পাত্রীর বয়েসের জার্নিটা। একান্তই ব্যাক্তিগতভাবে, আমার এই গল্পটা খুব "বীন দেয়ার ডান দ্যাট" লেগেছে।

প্রসেনজিত -

নির্দ্বিধায়, "বেস্ট পারফরমেন্স টিল ডেট"। অ্যান্টনির চরিত্রে ওভার-অ্যাকক্টিং না করার দুঃসাধ্য সাধন করে দেখিয়ে দিলেন যাকে বলে।  এবং তার সাথে পরপর ফ্রেমে কুশলের চরিত্র। তার অসহায়তা, সংকোচ, বশে-না-রাখতে-পারা পাগলামি। "দোসর" ছিল, "সব চরিত্র কাল্পনিক" ছিল, "চোখের বালি" বা "বাইশে শ্রাবণ" ছিল, কিন্তু এইটায় যেন পুরনো সব না হলেও বেশ অনেকগুলো রেকর্ড ধুয়ে বেরিয়ে গেল।

যিশু -

অসম্ভব ভাল। অদ্ভুত একটা ম্যাচিওরিটি, বিষণ্ণতা আর পরিমিতিবোধ দিয়ে অভিনয় করেছে। কনফিডেন্ট অথচ হেল্পলেস, কনফিউসড অথচ ডেডিকেটেড, বিশ্বাস করতে পারছে না অথচ সহমর্মী, এইজাতীয় ন্যুয়ান্সেস কম ড্যায়ালগেও খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছে। অতীতে "লাস্ট লিয়ার" বা "চিত্রাঙ্গদা"-য় অসাধারণ অভিনয়, পাশাপাশি "ডান্স-বাংলা-ডান্স"-এ আর-নেওয়া-যাচ্ছেনা গোছের উপস্থিতি, এবং "জাতিস্মর"-এর এই পারফরমেন্স দেখে কেন জানিনা খুব সন্দেহ হচ্ছে - একেই বোধ হয় ডিকসনারিতে "ডিরেক্টার'স অ্যাক্টর" বলে!

অনন্যা -

সত্যিই অনন্যা! জাত অভিনেত্রী কাকে বলে, এবং তা যে এযুগেও সম্ভব, দেখিয়ে দিল। আমার ভদ্রমহিলাকে এমনিতে একটু কেমন পাকা টাইপের লাগে। কিন্তু এই একখানা কবিগানে জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছেন। ওই জেসচার পুল অফ করা - আমি তো অন্তত আর কাউকেই ভাবতে পারছি না। আইটেম-সঙ কি একেই বলে, যেটাকে সিনেমার থেকে আলাদা করে দেখালেও এক খণ্ড ইতিহাস সাক্ষী থেকে যায়?

বাকিরা সবাই -

অদ্ভুত ভাল কাস্টিং। আর সেইরকম পরিমিত অ্যাক্টিং, প্রত্যেকের। স্বস্তিকা, আবীর, এমনকি রিয়াও ভাল করেছে। খরাজের ভোলা-ময়রার কাস্টিং দেখলে মনে হয় - আরে, এই তো সে!

প্রসঙ্গান্তরে - 

না বললেই নয়, মায়ার সাথে ওর মায়ের কথোপকথনের ওই অংশটা মনের মধ্যে রেশ রেখে যায় -
- কবে বুঝলে মা, যে এটা সত্যিকারের ভালোবাসা?
- ওই তো, কেওড়াতলা থেকে ফিরে এসে তারপর।

কবীর সুমন -

"এ তুমি কেমন তুমি" নিয়ে তো আগেই বলেছি।

ভদ্রলোকের নীরব উপস্থিতি গোটা সিনেমাটা জুড়ে। আর সেই উপস্থিতি যেন ঘোষণা করে যে, যেটুকু ইতিহাস লেখা ওনার বাকি পড়ে রয়েছিল, সেটুকু লিখে ফেলার জন্যই এই প্রত্যাবর্তন।

সিনেমাটা এত ভাল হওয়া সত্ত্বেও এন্ড-টাইটেলকার্ডে যেই গমগমিয়ে হল জুড়ে "জাতিস্মর" বাজতে লাগলো, কির'ম জানি সব স্রেফ গুলিয়ে গেল। "আমিও কাঙ্গাল হলাম আরেক কাঙ্গালের পেতে দেখা" মন নিয়ে প্রচুর সেন্টি-টেন্টি খেয়ে চোখের জল আড়াল করে, যে ব্যাপারটা এই গানটা আরও একশোবার শুনলে আরও একশোবার হবে। ওই, কোডিং!

মনে হল, ভদ্রলোক মাঝখানের এই বেশ কয়েকবছর নষ্ট হওয়ার অভাবটা মিটিয়ে দেবেন আবার। এই আশাটাও তো এই সিনেমার থেকেই আরেকটা প্রাপ্তি।

সৃজিতদা -

কি আর বলব? খুব প্রাউড লাগছে। খুব।

Take a bow. Take many bows!



PS:

"স্বভাব যায় না ম'লে" অভ্যাসে আর দুটো কথা বলব কি বলব না করে বলতে ইচ্ছে করছে।

১। অ্যান্টনির স্ত্রী মিনি, যে সতীদাহ থেকে বেঁচে ফিরে এসে সমাজের তোয়াক্কা না করে একজন ফিরিঙ্গির সাথে সংসার বাঁধতে পারে, বরকে আশ্বাস দিয়ে কবিগানের কম্পিটিসানে পাঠিয়ে একা দুর্গাপুজোর দায়িত্ব নিতে পারে এবং মন্ডপ ছেড়ে না পালিয়ে আগুনে পুড়ে মরতে পারে, তাকে সিনেমায় শুধু ঝাঁটা হাতে পাতি একজন গাঁয়ের বঁধুর উপস্থিতিতে আর উচ্চারণে বলে দেওয়াটা কি একটু আনফেয়ার না? আমার মতে মিনির চরিত্রায়নটা আরেকটু যোগ্যতর হলে ভাল হতো।

২। শেষে কুশলের উপলব্ধিতা আর পুনর্জন্মের কানেকশানটা আমার একটু অতিরঞ্জিত, বা বলা চলে অতিরিক্ত, লাগল। হয়ত কুশলের অসুস্থতার ঘোর বলে জাস্টিফাই করা যায়, বা হয়ত সত্যিই জাতিস্মর গানটার মতো অ্যান্টনি তার ভালোবাসাকে খুঁজে ফিরছিল, বাট স্টিল।

তবে ওই। এগুলো নেহাতই PS।