Sunday, 2 February 2014

বাগবাজারের বাড়ি

"যদি কখনও একান্তে..."

উত্তর কলকাতা ব্যাপারটাই আলাদা। আমার পার্সোনাল মতামতের কথা যদি বলি, তাহলে দক্ষিণ কলকাতা অথবা নিজের পছন্দ-অপছন্দর নিরিখে বিচার করতে গেলে নম্বর অনেকটাই কাটা যাবে।

তায় আবার শ্বশুরবাড়ি।



তাই প্রত্যেকবারই যখন যাই, নিজের স্বাভাবিক আচারবিচার বা ব্যবহার ছাপিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচিত- অনুচিত, কি-জানি-কি-ভাববে জাতীয় নীরব বিচারবোধ এসে জুড়ে বসে আমাকে কেমন জানি একটু দোটানায় ফেলে দেয়। মনের মধ্যে একটা সংকোচ বা জড়তা চলতেই থাকে। প্রাণ খুলে হো হো করে হেসে ওঠা, ইচ্ছে মতো বেরিয়ে পড়া, পায়ের উপর পা তুলে খবরের কাগজ পড়া বা চা খাওয়ার পর কাপটা তুলতে ভুলে যাওয়ার অসাবধানতা-টা যে কোনোমতেই সম্ভব নয়, এই ব্যাপারটা কেমন জানি মনের মধ্যে অষ্টপ্রহর ওয়ার্নিং দিতে থাকে। একটা "Someone is watching you" টাইপের ভীতি, বিনা কারণেই।

কিন্তু এই লেখাটা সেসব নিয়ে নয়। এটা হল, এই সব কিছু সত্ত্বেও একটা অদ্ভুত ভাললাগার কথা নিয়ে।

এটা, বাগবাজারের বাড়িটাকে নিয়ে লেখা।

বাড়িটায় ঢুকলে প্রথমেই যেটা মনে হয়, প্রত্যেকবার, অবধারিতভাবে, সেটা হল যে বাড়িটার মধ্যে একটা অদ্ভুত শীতলতা আছে, শান্তি আছে। বিশেষ করে আমার তিনতলার ঘরটায়। (কেন জানিনা, ঘরটা এতই ভাল লাগে যে অকারণেই "আমার" শব্দটা ব্যবহার করতে ইচ্ছে করে। স্বত্বাধিকারে একেবারেই নয়, নেহাতই অকারণে।)

পাড়া-প্রতিবেশি, উত্তর কলকাতা সুলভ পাশের বাড়ির কৌতূহল বা অন্তরমহলের নিয়মকানুন, মোড়ের মাথায় চপের দোকানের বাইরে সন্ধ্যেবেলার উনুনের আঁচ, পাশের বাড়ি থেকে হারমোনিয়ামের সুর, বাড়ির পিছনের গলি দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই গঙ্গার ঘাট, এসব যাবতীয় আকর্ষণ-বিকর্ষণ পেরিয়ে ওই তিনতলার ঘরটায় একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা টের পাওয়া যায়। এই শীতলতা, শান্তি বা স্নিগ্ধতার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা বা লেখা খুব মুশকিল, কিন্তু অনুভুতিটাকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করাটা আরোই কঠিন।

এককথায় বলতে গেলে, ওই ঘরটা আর তার লাগোয়া ছাদ আর উঁচু কার্নিশের ওপারে বিকেলের কমলা আকাশ দেখলে প্রত্যেকবারই আমার ভীষণ গৃহবধূ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অফিস, ইনক্রিমেন্ট লেটার, বোনাসের আশা-নিরাশা জাতীয় চিন্তাভাবনাগুলো কেমন জানি অন্য কোনও জন্মের স্মৃতি বলে মনে হতে থাকে। একসাথে মন খারাপ, মন ভাল আর মন কেমন করার একটা অদ্ভুত মিশ্র আবেগ। বলে বোঝানো না যাওয়া অথচ ছেড়ে আসতে ইচ্ছে না করার একটা মিষ্টি রেশ।

PS: বাড়িটা হয়তো কোনদিন প্রোমোটারকে দিয়ে দেওয়া হবে।

PPS: আর না হলেই বা কি হত? আমার কি আর এইজন্মে কোনোদিন দুপুরে ঘুমিয়ে উঠে, বিকেলে গা ধুয়ে, পরিপাটি করে চুল বেঁধে, কাচা শাড়ি পরে ছাদের কার্নিশে থুতনি রেখে আকাশ দেখা হত?