Tuesday, 3 March 2015

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...

বাংলাদেশ নিয়ে, কেন জানিনা, চিরকালই মনের মধ্যে একটা ফ্যান্টাসি ছিল। তার একটা কারণ সম্ভবত ছোটবেলা থেকে পাড়ায় ক্লাবে বা আড্ডায় ওই বাঙ্গাল-ঘটি, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, ইলিশ-চিংড়ি বা পদ্মা-গঙ্গা (প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, ইলিশের স্বাদ বিষয়ক) নিয়ে নিয়মিত খুনসুটি আর ঝগড়াঝাঁটি। আর তাছাড়া বয়স্ক লোকজন কখনো জিগ্যেস করলে নিয়মমাফিক চেনা উত্তরটা দিয়ে দেওয়া, যে হ্যাঁ, আমার বাবা মা দু'পক্ষই আদতে ও'দেশের, আর অতঃপর "ওদেশের কোথায়?"-এর উত্তরে হেথায় ও সেথায়, ইত্যাদি।

বাংলাদেশ ছুঁয়ে দেখিনি কোনদিন। টাকি থেকে নদীর ধারে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ইছামতী দেখেছি বড়জোর, আর শুনেছি ওপারেই নাকি বাংলাদেশ। এই অবধিই আমার দৌড় আটকে থেকেছে। 


বাংলাদেশ বললেই মনের মধ্যে যে ছবিটা চিরকাল ভেসে ওঠে, বলতে দ্বিধা নেই যে তার রঙ অনেকটাই নানান উপন্যাস, কবিতা, সিনেমার কল্পনায় নিকোনো, এবং সেহেতু অবধারিতভাবে বাস্তবের তুলনায় অতিমাত্রায় রঙিন। প্রফুল্ল রায়ের কেয়া পাতার নৌকো, সুনীলের পূর্বপশ্চিম, আর তাছাড়া পদ্মা নদীর মাঝি, ব্যারিটোনে নিয়মিত "সুজলম সুফলম", ইত্যাদি ইত্যাদি আমার কল্পনার ফানুসে চিরকাল হাওয়া সাপ্লাই দিয়ে গেছে অকৃপণভাবে।

কেন জানিনা, নানান সূত্রে নানান গল্পকথা শুনে, অভিজ্ঞতা পড়ে, অথবা সাবকন্সাস একটা বায়াস থেকেই কিনা জানিনা, খুব আপন বলে মনে হত দেশটাকে। একদিকে ভোরের ধানক্ষেত, বিকেলের হাট, নদীর তীর ধরে হাঁটা,  একটা শান্ত, সুস্থির, আনন্দময় জীবনযাপনের ছবি, অন্যদিকে আবার দেশভাগ বা মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন অস্থিরতা, অসহায়তা, বিপ্লব - মোটের ওপর খুব রোম্যান্টিক লাগতো।সবকিছুই খুব নিজের মনে হত। সত্যি বলতে কি, হয়ত নিজের দেশের অন্যান্য প্রদেশের চেয়েও খানিক বেশি আপন। ভাবা যায়, একটা এমন দেশ যার জাতীয় ভাষাটাই বাংলা! আরও শুনতাম, ওদেশের লোকজনের আতিথেয়তা নাকি গল্প করার মতো - যারাই কখন গেছে, বলেছে, একদন আপন করে নেয়, আদরযত্নে ভরিয়ে রাখে। 

ভাবতাম, আমিও যাব। একদিন, কোন একদিন, নিশ্চয়ই যাব। না, হোটেল নয়, কারোর বাড়িতে থাকবো, যদিও কার বাড়ি জানিনা! আর তারপর, সকালে উঠে বাজার যাব, টাটকা শাক-সব্জি-ফল আর পুকুরে জাল ফেলে সদ্য ধরা মাছ, আর তারপর বাড়ি ফিরে উনুনে আঁচ দিয়ে জমিয়ে বসে রান্না। অনেকের জন্য, একসাথে। শাড়ি পরে। হ্যাঁ, অতি অবশ্যই শাড়ি পরে। বিকেলবেলা নদীর পার ধরে হাঁটবো, গায়ে পড়ে অচেনা লোকজনের সাথে আলাপ করব, ঠিকানা দেবো- নেবো। দেশে ফিরে মনে করে চিঠিও লিখবো ঠিক, ইন্ডিয়া পোস্টে। 

বাংলাদেশ যাওয়ার স্বপ্নটা মনের মধ্যে সেই ছোটবেলা থেকে লালন করেছি - কখনো একটা, কোনদিন একদিন, নিশ্চয়ই যাবো। 

 অঙ্কটা হঠাৎই ফেব্রুয়ারি ২০১৫তে বদলে দিলো অভিজিৎ রায়। সবকিছু দিব্যি যেমন চলে তেমনি চলছিল, হঠাৎ করে কথা নেই বার্তা নেই স্রেফ লেখার অপরাধে এক পড়তি শীতের দিনে ভর সন্ধ্যেবেলা, জনসমক্ষে, ভিড় করে থাকা মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টির নিরলজ্জতাকে সাক্ষী রেখে, পুলিস স্টেশানের মাত্র কয়েক গজ দূরে, চোপার দিয়ে কুপিয়ে খুন হয়ে গেলো ছেলেটা! কারোর পাকা ধানে মই দেয়নি, কোন রগরগে উস্কানিমূলক কথা বলেনি বা লেখেনি, কোন ব্যাক্তি আক্রমণ করেনি, ধর্ম আক্রমণ ও করেনি, স্রেফ যুক্তিবাদ আর নাস্তিকতার অপরাধে খুন হয়ে গেলো!


অভিজিতকে হারালাম আমরা। ওর আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল আমাদেরকে।


কিন্তু জানত বাংলাদেশ, হারালাম তোমাকেও। "জীবনে একবার অন্তত যাবোই যাবো" - এই কথাটা আর কোনদিন উচ্চারণ করবো না আমি। কোনোদিনও না।


তোমাকে হারালাম, বাংলাদেশ।